ভারতীয় সংবিধান (Indian constitutions) : জরুরি অবস্থা (Emergency)

আমাদের দেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল জরূরি অবস্থা সংক্রান্ত ক্ষমতা। দেশের মধ্যে উদ্ভূত বিশেষ পরিস্থিতিকে মোকাবিলার জন্য সংবিধান-এর অষ্টাদশ অংশে বর্ণিত হয়েছে তিন ধরনের জরুরি অবস্থা (Emergency) যা রাষ্ট্রপতি অস্বাভাবিক অবস্থার মোকাবিলার জন্য জারি করতে পারেন।
সংবিধানে তিন ধরনের জরুরি অবস্থা উল্লেখিত রয়েছে। যথা –
i) 352 নং ধারায় জাতীয় জরুরি অবস্থা (National Emergency)।
ii) 356 নং ধারায় রাজ্যের শাসনতান্ত্রিক অচলাবস্থা (Administrative Emergency) বা রাষ্ট্রপতি শাসন (Presidential rule)।
iii) 360 নং ধারায় আর্থিক জরুরি অবস্থা (Financial emergency)।

জাতীয় জরুরি অবস্থা (National Emergency)

যুদ্ধ, বহিরাক্রমণ বা দেশের মধ্যে সশস্ত্র বিদ্রোহের ফলে ভারতের বা তার কোনো অংশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবার সম্ভাবনা থাকলে বা বিঘ্নিত হলে রাষ্ট্রপতি জাতীয় জরুরি অবস্থা (National Emergency) জারি করতে পারেন। তবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদের লিখিত পরামর্শ ছাড়া রাষ্ট্রপতি এরূপ জরুরি অবস্থা (Emergency) ঘোষণা করতে পারেন না।

জাতীয় জরুরি অবস্থা (National Emergency) সম্পর্কে সংবিধানে (Constitutions) কিছু সংশোধন করা হয়েছে। যথা- ১৯৭৬ সালে ৪২ তম সংশোধনী আইনে রাষ্ট্রপতির সন্তুষ্টিকেই শেষ কথা এবং তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না বলা হয়েছিল, কিন্তু ১৯৭৮ সালের ৪৪ তম সংবিধান সংশোধনী আইনে এটি বাতিল করা হয়েছে।

বর্তমানে জাতীয় জরুরি অবস্থা (Emergency) ঘোষণার ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি ও ক্যাবিনেটের সিদ্ধান্তই যথেষ্ট নয়। জরুরি অবস্থা ঘোষণার ১ মাসের মধ্যে পার্লামেন্টে এটি উত্থাপন করতে হয় এবং পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন লাভ করলে জাতীয় জরুরি অবস্থা ৬ মাস পর্যন্ত বলবৎ থাকতে পারে।

জাতীয় জরুরি অবস্থা (National Emergency) জারি করার ৬ মাস পর প্রয়োজনে পার্লামেন্ট প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিবার ৬ মাস করে এর মেয়াদ বৃদ্ধি করতে পারে। তবে সর্বাধিক কতদিন পর্যন্ত এরূপ জরুরি অবস্থা বলবৎ থাকবে সে বিষয়ে সংবিধানে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশ নেই।

আমাদের দেশে আজ পর্যন্ত ৩ বার জরুরি অবস্থা (Emergency) জারি করা হয়েছে। যথা – প্রথমটি হয় ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন ২৬ অক্টোবর ১৯৬২ সালে চিন-ভারত সীমান্ত বিরোধের সময়। এটি ১০ জানুয়ারি ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল। দ্বিতীয়টি ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় বারাহগিরি ভেঙ্কটগিরি রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন বলবৎ হয়েছিল। তৃতীয়টি ২৫ জুন ১৯৭৫ সালে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার অজুহাতে ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন ঘোষিত হয়েছিল।

আরও পড়ুন:  Bengali General knowledge Mock test 05 for all Competitive Exam

১৯৬২ সালের জরুরি অবস্থার সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু। ১৯৭১ সালের ও ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সময় ইন্দিরা গান্ধি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

জাতীয় জরুরি অবস্থার সময় :
১) কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারগুলিকে নির্দেশ দিতে পারে এবং নির্দেশ মানতে রাজ্য বাধ্য থাকে।
২) পার্লামেন্ট আইন প্রণয়ন করে লোকসভার মেয়াদ ১ বছর বৃদ্ধি করতে পারে।
৩) সংবিধানের ১৯ নং ধারায় বর্ণিত স্বাধীনতার অধিকারগুলি স্থগিত রাখা হতে পারে। তবে ২১ নং ধারায় বর্ণিত জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকারকে ক্ষুন্ন করা যায় না।

শাসনতান্ত্রিক অচলাবস্থা (Administrative Emergency)
বা
রাষ্ট্রপতি শাসন (Presidential rule)

সংবিধানের ৩৫৬ নং ধারা অনুসারে কোনো রাজ্যের রাজ্যপালের রিপোট থেকে অথবা অন্য কোনো উপায়ে রাষ্ট্রপতি যদি অবগত হন যে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের শাসনব্যবস্থা সংবিধান (Constitutions) অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে না তবে তিনি শাসনতান্ত্রিক অচলাবস্থা (Administrative Emergency) বা রাষ্ট্রপতি শাসন (Presidential rule) ঘোষণা করতে পারেন।

শাসনতান্ত্রিক অচলাবস্থা (Administrative Emergency) বা রাষ্ট্রপতি শাসন (Presidential rule) ঘোষণার ২ মাসের মধ্যে তা পার্লামেন্টের উভয়কক্ষে পেশ করতে হয় এবং অনুমোদিত হলে ৬ মাস পর্যন্ত বলবৎ হয়। সর্বাধিক ১ বছর পর্যন্ত বলবৎ থাকতে পারে। তবে নির্বাচন হবার মতো পরিবেশ না থাকলে ৩ বছর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা যেতে পারে।

১৯৭৫ সালের ৩৮তম সংবিধান সংশোধনী আইন অনুযায়ী রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন (Presidential rule) জারি করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সন্তুষ্টিকেই চূড়ান্ত বলে বিবেচনা করা হবে। কিন্তু ১৯৭৮ সালের ৪৪ তম সংশোধনী আইনে এটি পরিবর্তিত হয়। এক্ষেত্রে বলা হয় বিচার বিভাগই শেষ কথা বলার অধিকারী। যেমন ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসে মধ্যপ্রদেশে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হলে ১৯৯৩ সালের এপ্রিল মাসে হাইকোর্ট তা খারিজ করে দেয়।

কোনো রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন (Presidential rule) জারি হলে যেসমস্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগুলি রাষ্ট্রপতি নিয়ে থাকেন সেগুলি হল –
১) রাজ্যের শাসন সংক্রান্ত সমস্ত ক্ষমতা নিজের হাতে গ্রহণ।
২) রাজ্য আইন সভার যাবতীয় ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতে অর্পণ।
৩) পার্লামেন্টের অনুমোদনক্রমে ভারতে সঞ্চিত তহবিল থেকে ওই রাজ্যের ব্যয়নির্বাহের অনুমতি দিতে পারেন।

আরও পড়ুন:  ভারতীয় সংবিধান (Indian constitutions) : স্বাধীনতার অধিকার (Right to Freedom)

বর্তমানে ভারতের ২৯ টি রাজ্যে বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন কারণে রাষ্ট্রপতি শাসন (Presidential rule) জারি করা হয়েছে। যেমন –
১) পশ্চিমবঙ্গে ৪ বার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছে। যথা-১৯৬২ সালে বিধানচন্দ্র রায় থাকাকালীন, ১৯৬৮ সালে প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ থাকাকালীন, ১৯৭০ সালে অজয় কুমার মুখার্জি থাকাকালীন ও ১৯৭১ সালে প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ থাকাকালীন।
২) ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে মণিপুরে সবচেয়ে বেশি রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছে (১০ বার)। যথাক্রমে – ১৯৬৭ সালে দুইবার ও একবার করে ১৯৬৯, ১৯৭৩, ১৯৭৭, ১৯৭৯, ১৯৮১, ১৯৯২, ১৯৯৩ ও ২০০১ সালে।
৩) পাঞ্জাবে ৮ বার। যথা – ১৯৫১, ১৯৬৬, ১৯৬৮, ১৯৭১, ১৯৭৭, ১৯৮০, ১৯৮৩, ১৯৮৭ সালে।
৪) উত্তরপ্রদেশে ৯ বার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছে। যথা – ১৯৬৮, ১৯৭০, ১৯৭৩, ১৯৭৫, ১৯৭৭, ১৯৮০, ১৯৯২, ১৯৯৫ ও ২০০২ সালে।
৫) বিহারে ৮ বার। যথা – ১৯৬৮, ১৯৬৯, ১৯৭২, ১৯৭৭, ১৯৮০, ১৯৯৫, ১৯৯৯, ২০০৫ সালে।
৬) কর্ণাটকে ৬ বার। যথা – ১৯৭১, ১৯৭৭, ১৯৮৯, ১৯৯০ এবং ২০০৭ সালে ২ বার।
৭) ওড়িশাতে ৬ বার। যথা – ১৯৬১, ১৯৭১, ১৯৭৩, ১৯৭৬, ১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালে।
৮) কেরলে ৫ বার। যথা – ১৯৫৬, ১৯৫৯, ১৯৬৪, ১৯৭০ ও ১৯৭৯ সালে।
৯) গোয়াতে ৫ বার। যথা – ১৯৬৬, ১৯৭৯, ১৯৯০, ১৯৯৯ ও ২০০৫ সালে।
১০) গুজরাটে ৫ বার। যথা – ১৯৭১, ১৯৭৪, ১৯৭৬, ১৯৮০ ও ১৯৯৬ সালে।
১১) জম্মু ও কাশ্মীরে ৫ বার। যথা – ১৯৭৭, ১৯৮৬, ১৯৯০, ২০০২ ও ২০০৮ সালে।
১২) আসামে ৪ বার। যথা – ১৯৭৯, ১৯৮১, ১৯৮২, ১৯৯০ সালে।
১৩) নাগাল্যান্ডে ৪ বার। যথা – ১৯৭৫, ১৯৮৮, ১৯৯২ ও ২০০৮ সালে।
১৪) রাজস্থানে ৪ বার। যথা – ১৯৬৭, ১৯৭৭, ১৯৮০, ১৯৯২ সালে।
১৫) তামিলনাড়ুতে ৪ বার। যথা – ১৯৭৬, ১৯৮০, ১৯৮৮ ও ১৯৯১ সালে।
১৬) ত্রিপুরাতে ৩ বার। যথা – ১৯৭১, ১৯৭৭, ১৯৯৩ সালে।
১৭) মধ্যপ্রদেশে ৩ বার। যথা – ১৯৭৭, ১৯৮০ ও ১৯৯২ সালে।
১৮) মিজোরামে ৩ বার। যথা – ১৯৭৭, ১৯৭৮, ১৯৮৮ সালে।
১৯) হরিয়ানাতে ৩ বার। যথা – ১৯৬৭, ১৯৭৭ ও ১৯৯১ সালে।
২০) ঝাড়খণ্ডে ৩ বার। যথা – ২০০৯, ২০১০ ও ২০১৩ সালে।
২১) অন্ধপ্রদেশে ৩ বার। যথা – ১৯৫৪, ১৯৭৩ ও ২০১৪ সালে।
২২) মেঘালয়ে ২ বার। যথা – ১৯৯১ ও ২০০৯ সালে।
২৩) হিমাচলপ্রদেশে ২ বার। যথা – ১৯৭৭ ও ১৯৯২ সালে।
২৪) সিকিমে ২ বার। যথা – ১৯৭৮ ও ১৯৮৪ সালে।
২৫) দিল্লিতে ২ বার। যথা- ১৯৫৬ ও ২০১৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। অরবিন্দ কেজরিওয়াল-এর ইস্তফার কারণে।
২৬) অরুণাচল প্রদেশে ১ বার, ১৯৭৯ সালে।
২৭) মহারাষ্ট্রে ১ বার, ১৯৮০ সালে।

আরও পড়ুন:  ভারতের বন নীতি (Forest policy) ও বন আইন (Forest law)

আর্থিক জরুরি অবস্থা (Financial emergency)

সংবিধানের ৩৬০ ধারা অনুসারে রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন যে, এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে যার দ্বারা সমগ্র ভারতের বা তার কোনো অংশের আর্থিক স্থায়িত্ব ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে তাহলে তিনি আর্থিক জরুরি অবস্থা (Financial emergency) ঘোষণা করতে পারেন।

এটি ঘোষণার ২ মাসের মধ্যে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের সম্মতি লাভ করতে হয়। একবার সম্মতিলাভ করলে আর্থিক জরুরি অবস্থা (Financial emergency) অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত চলতে পারে।

১৯৭৮ সালের ৪৪ তম সংবিধান সংশোধনীতে আর্থিক জরুরি অবস্থা (Financial emergency) ঘোষণার ব্যাপারে রাষ্ট্রপতির সম্মতিকে চূড়ান্ত বলে ধরা হয়নি। এ বিষয়ে আদালতে প্রশ্ন তাোলা যেতে পারে।

আর্থিক জরুরি অবস্থা (Financial emergency) ঘোষিত হলে – (১) রাজ্য সরকারগুলিকে আর্থিক নিরাপত্তা রক্ষার ব্যাপারে নির্দেশ দিতে পারেন, (২) কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের এমনকি বিচারপতিগণের বেতন হ্রাসের নির্দেশ দিতে পারেন এবং (৩) রাজ্য আইন সভা কর্তৃক গৃহীত অর্থবিল বিবেচনার জন্য তার কাছে প্রেরণ করার নির্দেশ দিতে পারেন।

যদিও আজ পর্যন্ত ভারতবর্ষের কোনো অংশে আর্থিক জরুরি অবস্থা (Financial emergency) জারি হয়নি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.